Saturday, March 31, 2007

দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালাঃ অ্যাংকরেজ, আলাস্কা (২)



মাঝরাতে গিয়ে পৌছলাম অ্যাংকরেজে৷ রেন্টাল কার নিতে গিয়ে দেখি গাড়ি নাই৷ মিড সাইজ গাড়ি রিজার্ভেশন দিয়েছিলাম, অনেক ঘাটাঘাটি করে বললো এত রাতে ৭ সিটের ভ্যান ছাড়া আর কিছু দিতে পারবে না৷ মডেল ডজ ক্যারাভান৷ মনে মনে খুশীই হলাম, যদিও মুখে প্রকাশ করলাম না, কারন বড় গাড়িতে একটু আরাম করে ঘোরা যায়৷ ডজের গাড়ি গাড়িটায় পেছনের সিটে চাইলে একজন শুয়ে ঘুমাতেও পারে৷ একটা সিদ্ধান্ত আমার প্রায়ই ভুল হতো, সেট হচ্ছে খুজে খুজে একদম সস্তা মোটেলে ওঠা৷ আসলে সামান্য একটু বেশী খরচ করলে তুলনামুলক ভাবে অনেক ভাল হোটেলে থাকা যায়৷ যাইহোক অলাস্কায় নির্জন রাতে গাড়ি নিয়ে মোটেলের দিকে রওনা হলাম৷ বেশ একটু ভয় ভয় করছিল৷ এয়ারপোর্ট থেকে মোটেল ৫-৭ মাইল দুরে, রাস্তায় কোন লোকজন থাক দুরের কথা, গাড়িও খুব কম৷


মোটেলের রিসেপশনিস্ট বিরক্তভাবে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল৷ বাইরে যেমন ভাঙাচোরা অবস্থা ভিতরে আরও খারাপ৷ এসব মোটেলে বিছানায় প্রায়ই মানুষের লোম পড়ে থাকে, এজন্য এবার বাসা থেকে চাদর নিয়ে এসেছি৷ ব্যাগ থেকে ক্যামেরা, ফোন, ল্যাপটপ বের করে চার্জে দিয়ে দিলাম৷ প্লেনে তোলা অরোরার ছবিগুলো ল্যাপটপে ট্রান্সফার করে দেখার চেষ্টা করলাম, পুরান ল্যাপটপের এলসিডিতে দেখাই যাচ্ছিল না, মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল৷ আলাস্কা GMT-9 টাইম জোনে, রাত দুটার দিকে যখন ঘুমাতে যাচ্ছি তখন আমার বায়োলজিকাল ঘড়িতে প্রায় ভোর হয় হয়৷


ফোনের চি্তকারে ঘুম ভাঙ্গলো, আমার বন্ধু তার দল নিয়ে রওনা দিচ্ছে৷ রওনা দেয়ার খবর এত ঘটা করে জানানোর দরকার ছিল না, কাচা ঘুমটা ভেঙ্গে শরীর খারাপ লাগছিল৷ বাথরুমে বসে একটু কসরত করলাম, আসলে এত নোংরা মনে হচ্ছিল যে ছেলে হয়েও খুব বেশীক্ষন বসে থাকতে ভাল লাগছিল না৷ আরেকটু গড়াগড়ি করে গোসল করে ব্যাগট্যাগ নিয়ে বের হয়ে গেলাম৷


এই মোটেলে কোন ব্রেকফাস্ট নেই৷ বিল দিয়ে বের হয়ে আসলাম৷ একটা বিশাল বড় লিস্ট নিয়ে আসছি আলাস্কায় কি কি করব, আসলে বলতে গেলে ৭০-৮০ পৃষ্ঠার চোথা৷ নানা রকম অল্টারনেট হিসাব করা আছে ওখানে৷ অ্যাংকরেজ ঠিক সরাসরি প্যাসিফিকের (এক্ষেত্রে গাল্ফ অফ আলাস্কা) পাড়ে না, বরং বাংলাদেশে বরিশাল যেমন কিছুটা ভেতরে অনেকটা ওরকম৷ ওরা নাম দিয়েছে কুক ইনলেট৷ এর আবার দুটা শাখা নিক আর টার্নএগেইন আর্ম৷ একটা দেড় ঘন্টার লঞ্চ (এখানকার ভাষায় Ferry) ট্যুর আছে আশে পাশের গ্লেসিয়ার গুলোতে, সকালে দেখি ঐটা ধরা যায় কি না৷


প্রচুর ওয়ান ওয়ে রাস্তা এইখানে, এম্নিতেই নতুন জায়গায় আমি পথঘাট চিনতে পারি না৷ আমার চোথা অনুযায়ী যেখানে লঞ্চঘাট হওয়ার কথা সেখানে এসে দেখি একটা বড় হোটেল, আশে পাশে কোন নদী বা এরকম কিছু নেই৷ ব্যপার কি৷ ফোন করার পর টিকেট বিক্রেতা মহিলা বলল আসলে হোটেলটা হচ্ছে টিকেট কাঊন্টার, সত্যিকার লঞ্চঘাট এখান থেকে এক ঘন্টার ড্রাইভ (৫০ মাইল দুরে)৷ বলে কি এই মহিলা৷ ফেরী ছাড়তে আর সময় আছে ১৫ মিনিট৷ মনটা খারাপ হয়ে গেল, প্ল্যান করে আসছি কুক ইনলেট ঘুরে দেখব, ধুত্তোর৷


অ্যংকরেজ মিউজিয়ামে গেলাম৷ চমত্কার করে সাজানো৷ আলাস্কার আদিবাসীদের মধ্যে আছে এস্কিমো (ইনুইট), আথাবাস্কান আর আলিউট৷ ১৫/১৬ হাজার বছর আগে সাইবেরিয়া থেকে বেরিঙ প্রনালী, আলাস্কা হয়ে মানুষ প্রথম আমেরিকা তে আসে৷ এদের বংশধররাই এখনো আলাস্কায় আছে, আর যারা আরো দক্ষিনে গিয়েছিল তাদের থেকে কালক্রমে আজটেক, মায়া, বা ইনকাদের জন্ম হয়েছে৷ যাদুঘরে চমত্কার সব নিদর্শন আছে এই মাইগ্রেশনের৷ প্রাগৈতিহাসিক সময়ে (১০ হাজার বছর বা তার আগে) এসব এলাকায় ম্যামথ, ঊলি রাইনো (লোমশ গন্ডার) ছিল৷ ইনুইটদের তৈরী ম্যমথের (বরফ যুগের লোমশ হাতি) দাত বা হাড় থেকে বানানো অনেক সরঞ্জাম দেখলাম৷


দুপুরে আমাদের দলের বাকীরা এলে আবার এয়ারপোর্ট যেতে হলো৷ পথে যেতে যেতে দিগন্তে চুগাছ (Chugach) পর্বতমালা দেখা যাচ্ছিল, হঠাত্ কেন যেন ঠিক রাঙামাটির পাহাড়গুলোর মতো মনে হচ্ছিল৷ এতদিন এখানে পাহাড় বলতে রকি মাউন্টেইন স্টাইলটাই মনে হতো, আলাস্কার পাহাড়গুলো কোনভাবে মেইনল্যান্ডের চেয়ে আলাদা৷ পরের দিন গুলোতে ডেনালী বা্ Wrangle-St Elias এও একই ব্যাপার খেয়াল করেছি৷ যাহোক পুরো দল একসাথে হয়ে পেট ভরে খেয়ে নিলাম, এক ফাকে আমি ওয়ালমার্ট থেকে ব্ল্যাংক সিডি কিনে নিলাম, প্রতিদিনের ছবি প্রতিদিন সিডিতে লিখে রাখব, নাহলে কখন ল্যাপটপের হার্ডড্রাইভ ক্র্যাশ করে কে জানে৷


এখন গন্তব্য ডেনালী ন্যাশনাল পার্ক৷ ডেনালীতে উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে ঊচু পর্বতের চুড়া আছে (মাউন্ট ম্যাকিনলী ২০,৩২০ ফিট, এভারেস্ট ২৯,০০০) কিন্তু ম্যাকিনলী দেখতে পাওয়া ভাগ্যের ব্যপার, কারন বছরের বেশীরভাগ সময়েই মেঘে ঢাকা থাকে, বিশেষ করে বছরের এই সময়ে তো দেখা আরো কঠিন৷ আলাস্কাতে ফ্রীওয়ে কম, বা সেভাবে নাই বল্লেই চলে৷ কে চালাবে এই নিয়ে একটু বিতন্ডা হচ্ছিল, সবাই টায়ার্ড, ঝামেলা কমাতে রাজী হয়ে গেলাম৷


বন্ধুদের কারো কারো সাথে বেশ অনেকদিন পরেই দেখা৷ সবাই সবার ব্যাপারে আপডেট নিচ্ছিল, কে কি করল, কদ্দুর এগোলো ক্যারিয়ার, কেউ কেউ সংখ্যা বাড়নোর চেষ্টায় আছে, কিন্তু এক আর একে ঠিক তিন হচ্ছে না ইত্যাদি৷ ওয়েবে অনেক ছবি দেখে এসেছি ডেনালীর এবং ডেনালী যাওয়ার পথের৷ শুরুতে খুব একটা সুবিধা হচ্ছিল না, সেই একই ফার, পাইন গাছের সারি, পার্মা ফ্রস্টে রঙচঙা গুল্মের কোন খোজ নেই৷

এ্যাংকরেজ থেকে ডেনালী ৪০০ কিমি, পাচ ঘন্টার রাস্তা৷ রাতে না ঘুমিয়ে চালাতে একটু খারাপ লাগছিল, আবার রাস্তায় সবজায়গায় ডিভাইডার নেই, বিপরীত দিক থেকে লরী আসতে দেখলে একটু ভয়ই লাগে৷ আড়াইটা-তিনটার দিকে রওনা দিয়েছিলাম, একসময় দুপুর গড়িয়ে বিকেল, সেখান থেকে সন্ধ্যা হবার জোগাড়, এখনও না কোন উল্লেখযোগ্য প্রানী না সেই রঙিন বেরী (জাম?) গুল্ম৷ ঠিক তখনই দেখি একটা Moose (তাড়াহুড়ায় ছবি তোলা হয় নি) রাস্তা পার হচ্ছে৷ আমাদের দেখে বেচারা দিল দৌড়, দৌড় দিয়েই ভালো করেছে অবশ্য কারন ধাক্কা লাগলে দুর্ঘটনা হতে পারত৷ একবার হরিনের সাথে ধাক্কা লেগে যে অবস্থা হয়েছিল, এরপর আর কোনদিন এসব বোকারামকে ধাক্কা দিতে চাই না৷ এরপরই যেন ভাগ্য খুলে গেল আমাদের৷ পাইন আর ফারের বন পরিষ্কার হয়ে একটু খোলা জায়গায় চলে আসলাম৷ রাস্তার দুপাশেই বেশ দুরে পাহাড়, তার আগে খোলা মাঠের মতো (meadow), আর মাঠ ভর্তি নানা রঙের বেরী জাতীয় গুল্ম৷ আলাস্কায় ঠান্ডার জন্য মাটির নিচে একটু গভীরে যে বরফ থাকে সেটা কখনই গলে না৷ এরা বলে পার্মাফ্রস্ট৷ বরফের জন্য বড় গাছ জন্মাতে পারে না, সে জন্য জন্মায় ঘাস বা নানা জাতের ছোট উদ্ভিদ৷
কি যে অপার্থিব দৃশ্য খালি চোখে না দেখলে বোঝা মুস্কিল৷ ক্যামেরার সাধ্য নেই এই ছবি তুলে ধরার৷ ডেনালী পর্বতমালার ব্যাকড্রপে মনে হচ্ছিল আলাস্কা আসার ৫০% অলরেডি সার্থক৷

Labels: ,

Saturday, January 13, 2007

দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালাঃ আলাস্কা-১



আলাস্কা কয়েক পর্বে লিখব, অনেক কিছু লেখার ইচ্ছা আছে, যদিও ভ্রমন কাহিনী গুলো পাঠক টানতে পারছে না৷ আলাস্কা যাওয়ার আগ্রহ আমার অনেক পুরোনো৷ এরকম বেশ কয়েকটা জায়গা আছে তরুন থাকতে থাকতে ঘুরতে চাই, যেমন মঙ্গোলিয়া, ইস্টার দ্বীপ, তাঞ্জানিয়ার সেরেঙ্গেটি, আমাজন, এ্যান্টার্কটিকা আরও অনেক৷ কবে যাব বা আদৌ সবগুলো ঘোরা হবে কি না জানি না৷ আশা রাখতে দোষ কি!

এক সপ্তাহের ট্রিপের জন্যে আমি প্ল্যান করি তিন মাস ধরে৷ কে জানে অপচয় কি না, হয়তো অন্যরা অন্যভাবে করে, কিন্তু আমার কাছে ঘাটাঘাটি করতে ভালই লাগে৷ আলাস্কা যুক্তরাস্ট্রের একটা প্রদেশ হলেও সাইজে বেশ বড়৷ আয়তনে মোটামুটি ভারতের অর্ধেক, বাংলাদেশের ১০গুনেরও বেশী৷ জনসংখ্যা ৬ লক্ষ, মানে ঢাকার মিরপুরের চেয়েও কম৷ এদের অনেকেই আবার পর্যটক৷ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় রাস্তা ঘাট কম৷ এক সময় আলাস্কা রাশিয়ার অধীনে ছিল, পরে রাশিয়ার জার মাত্র সাত মিলিয়ন ডলারে আলাস্কা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বেচে দেয় (১৮৬৭ সালে)৷ যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে যাওয়ায় অবশ্য আলাস্কার ভাগ্য বদলে গেছে বলতে হবে, নাইলে হয়তো সাইবেরিয়ার মত হয়ে বসে থাকত৷


আলাস্কা কিন্তু সাইবেরিয়ার ঠিক পাশে, ম্যাপ নিয়ে বসলে দেখবেন রাশিয়া ইউরোপ থেকে শুরু হয়ে এশিয়া হয়ে আমেরিকায় এসে ঠিক আলাস্কার আগে শেষ হয়েছে৷ আলাস্কা আর সাইবেরিয়ার মাঝে বেরিং প্রনালী৷ বেরিং প্রনালী আগে ছিল না, আগে মানে বেশ আগে, ১৬ হাজার বছর আগে বরফ যুগের সময়৷ তখন ওখানে একটা মহাদেশ ছিল বেরিঞ্জিয়া৷ এশিয়া আর আমেরিকা বেরিঞ্জিয়ার কারনে সংযুক্ত ছিল৷ ঐ সময় সাইবেরিয়ানরা হেটেই পুর্ব এশিয়া থেকে আমেরিকায় এসেছে৷ আজকের যুগের নেটিভ আমেরিকান বা রেড ইন্ডিয়ান বলতে যাদের বুঝি তারা আসলে ওই সাইবেরিয়ানদের বংশধর৷ একটু খেয়াল করলেই অবশ্য নেটিভ আমেরিকানদের সাথে সাইবেরিয়ান এমনকি চিন বা কোরিয়ানদের চেহারার মিল খুজে পাওয়া যায়৷ মানুষের ইতিহাসে একটা গ্রেট জার্নি হচ্ছে বরফ যুগে এশিয়া থেকে আমেরিকায় যাওয়া৷ এরপর বরফ যুগ শেষ হয়ে গিয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়তে থাকলে বেরিঞ্জিয়া পানির নীচে তলিয়ে যায়, আলাস্কা এক পর্যায়ে সাইবেরিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে৷

ঠিক কোন সময়ে যাওয়া যায় ভেবে পাচ্ছিলাম না৷ শীতে অরোরা দেখা যায় সহজে, একটা নামকরা ডগ স্লেডিং রেস হয় ঐ সময়৷ অনেক সিনেমাতে আলাস্কার গোল্ডমাইন, স্লেডিং আর মাইনারদের নিয়ে কাহিনী দেখেছি৷ কিন্তু শীতে ঠান্ডাটা একটা বিরাট সমস্যা, বিশেষত আলাস্কার ঠান্ডা৷ জুনে গেলে গরমের সময় সুবিধা হচ্ছে ২২-২৪ ঘন্টা দিন পাওয়া যায়৷ সংক্ষিপ্ত গ্রীষ্মে গাছপালা আর পশুপাখী দেখার জন্য সবচেয়ে ভালো সময়৷ গ্রীষ্মের তিন মাস ছাড়া বাকী সময় ন্যাশনাল পার্কগুলো বন্ধ থাকে৷ কিন্তু দিনের আলোর কারনে অরোরা দেখার কোন রাস্তা নেই৷ অরোরা আমার লিস্টে খুব হাই প্রায়োরিটি, ফাইভ থেকে অপেক্ষা করছি অরোরা দেখব বলে৷ শরতকালে (অথবা এখানকার ভাষায় ফল) কয়েক ঘন্টার জন্য রাত হয়, সুতরাং অরোরা দেখার একটা সুযোগ আছে, আবার সেপ্টেম্বর ১৫র আগে যেতে পারলে ন্যাশনাল পার্ক খোলা থাকার একটা সম্ভাবনা আছে৷ সমস্যা হচ্ছে ঐ সময় আলাস্কাতে সবচেয়ে বেশী বৃষ্টি হয়৷ আকাশ মেঘলা থাকলে অরোরা দেখার চান্স শুন্য৷ আবার বৃষ্টি থাকলে ন্যাশনাল পার্কে গিয়েও যে খুব একটা ওয়াইল্ড লাইফ দেখা যাবে এমন আশা কম৷ অনেক ভেবে চিন্তে বাজেটের কথা হিসাব করে সেপ্টেম্বরেই যাব ঠিক করলাম, গ্যাম্বল, কিন্তু যদি পে অফ করে তাহলে দুই ট্যুরের দেখা একবারে হয়ে যাবে৷

আরেকটা সম্ভাবনা মাথায় আসলো যে প্লেন যেহেতু ৩০,০০০ ফুট ওপর দিয়ে যাবে, সুতরাং আবহাওয়া মেঘলা হলেও প্লেন মেঘের ওপরেই থাকবে৷ সুতরাং যদি আমি এমনভাবে টিকেট কাটি যে প্লেন যখন আলাস্কার ওপর দিয়ে যাবে তখন রাত, তাহলে প্লেনে বসেই অরোরা দেখতে পাবো বা পাওয়া উচিত৷ কিন্তু অনেক ওয়েব ঘেটেও কেউ এভাবে অরোরা দেখেছে তার প্রমান পেলাম না৷ মাথায় ঢুকছিল না যে প্লেন থেকে কেন অরোরা দেখা যাবে না৷

আবার একটা টাইট প্ল্যান করলাম, বহু ব্রাঞ্চ তার৷ মানে একটা n-ary ট্রি এর মতো, যদি অমুক তারিখে আবহাওয়া এমন হয় তাহলে এই কাজ করব, যদি অমুক জায়গায় গিয়ে এরকম দেখি তাহলে এরকম ব্যবস্থা নেব৷ এর মধ্যে আরও অনেক ট্রাভেল প্ল্যান করে হাত পেকে গেছে, ট্রাভেলে কি কি সমস্যা হতে পারে, কোথায় কি অল্টারনেট রাখতে হবে৷ একটা বড় সমস্যা হচ্ছে পিপল ম্যানেজমেন্ট৷ সবাই সব জিনিস সমান ভাবে উপভোগ করবে না৷ দলে আবার বেশ কয়েকজন মেয়ে আছে, তাদের মেজাজ মর্জির ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে৷ সমস্যা হচ্ছে ন্যাকা মেয়ে কম, ন্যকা মেয়েদের সহজে নিয়ন্ত্রন করা যায়, কিন্তু আমার সঙ্গিরা টুকটাক ভুজুং ভাজুঙে মানবে না৷ কয়েকটা স্লট রাখলাম সহযাত্রি তোষনের জন্য, এছাড়া আগেই সবাইকে আলাস্কা নিয়ে নানা কাহিনী শুনিয়ে ত্যাক্তবিরক্ত করে ফেললাম৷

ফল এর সময়টাতে প্লেন ভাড়া সামারের চেয়ে একটু কম৷ ভালই হয়েছে অন্য খাতে ব্যায় বেশী করা যাবে৷ কাপড় চোপড় কিনতে একটু বেশী খরচ হয়ে গেল আবার৷ পরে বুঝতে পেরেছি একটু বেশী কিনে ফেলেছিলাম আমি, আসলে শীত অত বেশী না৷ অবশ্য যাওয়ার আগে পারলে আমি প্রায় তোষক কিনে ফেলি গায়ে দেয়ার জন্য৷ টাইম জোন চেঞ্জ হবে, তবে যেহেতু পশ্চিমে যাচ্ছি টাইম গেইন করব আমরা৷ যুক্তরাষ্ট্র পার হয়ে প্লেনে ক্যানাডিয়ান রকির ওপরে আসতেই দেখলাম নীচে ঘন অন্ধকার৷ কোন শহর দেখা যায় না৷ মনে মনে বললাম, খাইছে, প্লেন ভেঙ্গে পড়লে না শেষে ঐ সিনেমার মত মানুষের মাংস খেয়ে থাকতে হয়৷পুরো বৃটিশ কলম্বিয়া আর ইউকন টেরিটরিজে শহর খুব কম মনে হলো৷ পুরোটাই ঘোলাটে অন্ধকার৷

এয়ারপোর্টে যখন অপেক্ষা করছিলাম, এক কোরিয়ান পরিবার দেখি যাচ্ছে আমাদের সাথেই আলাস্কায়৷ সাথে ১০/১২ বছরের ছেলে৷ আরেক আমেরিকান ফ্যামিলির সাথে দেখলাম ভাল খাতির জমে গেল ওদের৷ আমেরিকাদের দলে অনেক লোক মনে হলো, বাবা, মা, ছেলে, দাদা, দাদী, আরো মনে হয় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল ওয়েটিং রুমে৷ তো সেই আমেরিকান লোক গল্প করছে কোরিয়ানের সাথে, যে সে মোট ৬ বার আলাস্কা গেছে কখনও অরোরা দেখেনি৷ এমনকি ফেয়ারব্যাংকসে গিয়েও দেখে নি৷ শুনে তো আমার মাথায় হাত৷ বলে কি এই লোক৷ অরোরা এত দূর্লভ?

কানাডা পার হয়ে আলাস্কার প্যান হ্যান্ডেলের ওপর আসতেই উত্তর দিগন্তে মনে হল সবুজ আভা ফুটে উঠেছে৷ প্রথমে ভাবলাম হয়তো মেঘ, কিন্তু রাতের বেলায় মেঘ সবুজ কেন? এয়ার হোস্টেসের কাছে জানতে চাইলাম, নাহ, ঠিকই আছে “অরোরা” দেখা যাচ্ছে৷ প্লেনটা এসময় নাক ঘুরিয়ে পশ্চিমমুখী যাচ্ছিল৷ আমি আগে থেকেই হিসাব করে ডান পাশের সারিতে জানালার পাশে সিট নিয়েছি৷ যদিও এয়ারপোর্টের আলোচনা শুনে একটু দমে গিয়েছিলাম, এখন ওভার এক্সাইটেড না হওয়ার চেষ্টা করলাম৷ কোরিয়ানরা পাশের সারিতে ঘুমাচ্ছে, একবার ভাবলাম ধাক্কা দিয়ে তুলে ফেলি, যে অরোরা দেখা যাচ্ছে৷ পরে ভাবলাম থাক, শেষে না ক্ষেপে যায়৷ প্লেনে গন্ডগোল করলে এয়ার মার্শাল এসে আবার ঘাপলা করতে পারে৷ অরোরা মেরু বরাবর সেমি সার্কেল তৈরী করে দেখা যাচ্ছিল৷ সার্কেলের অন্য অংশ সাইবেরিয়া, স্ক্যান্ডিনেভিয়া থেকে দেখা যাবে৷ অরোরা কিন্তু চলমান, “ব্রাদার বেয়ার” মুভিটা দেখে থাকলে ওখানে যেমন দেখায় অনেকটা সেরকম৷ ছবি তুললাম অনেকগুলো, কিন্তু আমার ক্যামকর্ডারটা অত ভালো ছিল না, এজন্য ভিডিওতে আসে নি৷

(আরো আছে …)

Labels: ,

eXTReMe Tracker